» প্রধান প্রতিবেদন

নারী জাগরণের বিস্মৃতপ্রায় আরেক অগ্নিকন্যা

ভারতবর্ষে তখন বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসন বিদ্যমান। তৎকালিন কুমিল্লা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মি: ডগলাস একটি জনহিতকর কাজে হাত দিয়ে অর্থাভাবে বিপাকে পড়েন। তখনকার অনেক বিত্তশালীদের কাছে অর্থ সহায়তা চেয়ে তিনি নিরাশ হ’ন। এমতাবস্থায় সেই সময়কার হোসনাবাদ পরগনার জমিদার ফয়জুন্নেসা ডগলাসের জনহিতকর পরিকল্পনাটি সর্ম্পকে বিস্তারিত অবগত হন। এবং অর্থাভাবের সংবাদটিও তাঁর কর্ণগোচর হয়। তখন ফয়জুন্নেসা ডগলাসের পরিকল্পনাটি নিরীক্ষণ করে এর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে জনসাধারণের বৃহত্তর কল্যাণের বিবেচনায় চাহিত অর্থ প্রদান করতে সম্মত হন। তবে শর্ত থাকে যে বৃটিশ নিযুক্ত ম্যাজিষ্ট্রেট উক্ত অর্থ কর্জ হিসেবে নয়; বরং দান হিসেবে গ্রহণ করবেন।

সে সময় সমগ্র ভারতের ন্যায় বাঙালী মুসলমান সমাজ সব ক্ষেত্রেই বৃটিশদেরকে সন্দেহ ও ঘৃণার চোখে দেখতো। বিষয়টি নিশ্চয় ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেবের অজানা ছিলনা। তথাপি ফয়জুন্নেসার মত একজন বিদূষী রমণী’র এই অপ্রত্যাশিত দান মি: ডগলাসকে হতবাক করে দেয়। ফয়জুন্নেসার এমন অভাবনীয় উদারতায় মুগ্ধ হয়ে মি: ডগলাস বিষয়টি মহারাণী ভিক্টরিয়াকে অবহিত করেন। রাণী ভিক্টরিয়াও বিষয়টি অবগত হয়ে অত্যন্ত খুশি হন। এবং ফয়জু্ন্নেসার প্রতি প্রীত হয়ে জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেন, সরকারিভাবে যেন তাঁকে সম্মানিত করার জন্য ‘বেগম’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
খবরটি শুনে ফয়জুন্নেসা বিনীতভাবে প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেন। কারণ, ইতোমধ্যে জমিদারেরন তনয়া এবং আরেক জমিদারের সহধর্মীনি হিসেবে তিনি ‘বেগম’ হিসেবে সবার কাছে সমধিক পরিচিত। তাই নতুন করে ‘বেগম’ উপাধি নেয়া অনর্থক। মহারাণী ভিক্টরিয়া ব্যাপারটির গুরুত্ব উপলদ্ধি করে স্থির করেন যে, বৃটিশ ভারতের এ নিভৃত পল্লীর এই বিদূষী রমণী’র যথার্থ উপাধি হবে ‘নওয়াব’। তারই ফলশ্রুতিতে ১৮৮৯ সালে মহারাণী ভিক্টরিয়ার নির্দেশক্রমে ফয়জুন্নেসাকে এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ‘নওয়াব’ উপাধি দেয়া হয়।

নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী ছিলেন দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম মহিলা নওয়াব। এই নারী জাগরণের পথিকৃত রমণী ১৮৩৪ সালে বর্তমান কুমিল্লা জেলার লাকসাম থানার অর্ন্তগত পশ্চিমগাঁও নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। ফয়জুন্নেসা ছিলেন তৎকালিন বৃটিশ ভারতের জনপ্রিয় জমিদার,জমিদার আহমদ আলী চৌধুরী এবং আরাফান্নেসা চৌধুরীণী’র কন্যা। মোগল রাজত্বের উত্তরসূরী এই মহীয়সী নারীর ছিল দুই ভাই, এয়াকুব আলী চৌধুরী এবং ইউসুফ আলী চৌধুরী। তাঁর দু’জন বোনও ছিল। তাঁদের নাম লতিফুন্নেসা চৌধুরাণী এবং আমিরুন্নেসা চৌধুরাণী।

তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থার সাধারণ রীতি অনুযায়ী ফয়জুন্নেসা তাঁর অন্যান্য ভাই-বোনদের মতই রক্ষণশীল পরিবেশের মধ্যে বেড়ে উঠেন। যেখানে পর্দাপ্রথা ছিল নারীর জন্য বাধ্যতামূলক সেখানে এমন চারদেয়ালের মাঝে থেকেও ফয়জুন্নেসা ছিলেন স্বাধীনচেতা। এধরনের প্রতিবন্ধকতা তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। তিনি এগিয়ে গেছেন আপন লক্ষ্যে। ফয়জুন্নেসা তাঁর চিন্তা ও কর্মে ছিলেন পুরোপুরি আধুনিক । সেকালের সমাজ ব্যবস্থার সকল বাঁধা পেরিয়ে তিনি ছিলেন মন মানসিকায় সম্পূর্ণ কুসংস্কারমূক্ত।
তৎকালিন সমাজ ব্যবস্থার অন্যতম অন্ধকার দিক মেয়েশিশুদের বিদ্যালয়ের দোরগাড়া পর্যন্ত পৌঁছাতে দিতো না। তারা বাড়ীর চারদেয়ালের মধ্যেই বন্দী থাকতো। কিন্তু শিক্ষার প্রতি ফয়জুন্নেসার অদম্য আগ্রহ দেখে তাঁর পিতা তাঁর জন্য বাড়ীতে গৃহশিক্ষক রাখার ব্যবস্থা করেন।

ফয়জুন্নেসা খুবই দ্রুত আরবি, ফার্সি’র পাশাপাশি বাংলা ও সংস্কৃতি ভাষায় বুৎপত্তি অর্জন করেন। ১৮৬০ সালে আরেক স্বনাম জমিদার সৈয়দ মোহাম্মদ গাজী’র সাথে তাঁর বিয়ে হয়। কিন্তু, সংসারের কঠিন দায়িত্বও তাঁকে জ্ঞান আহরণের তীব্র আগ্রহ থেকে টলাতে পারেনি। তাঁর দুই কন্যা
আরশাদুন্নেসা এবং বদরুন্নেসাসহ পরিবার সামলেও তিনি হ’ন বৃটিশ ভারতের প্রথম মহিলা কবি। ১৮৭৬ সালে তাঁর প্রথম গ্রন্থ ‘রুপজালাল’ প্রকাশিত হয়। অবশ্য তাঁর দাম্পত্য জীবন সুখের হয়নি। তিনি ছিলেন মোহাম্মদ গাজী’র দ্বিতীয় স্ত্রী। এক পর্যায়ে তাঁদের বিচ্ছেদ ঘটে। ১৮৭৩ সালে পিতার মৃত্যুর পর তিনি পশ্চিমগাঁও-এর জমিদারি লাভ করেন এবং ১৮৮৫ সালে মায়ের মৃত্যুর পর মাতুল সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন।

নারীমুক্তি ও নারী অগ্রজাগরণের পথিকৃত এই মহীয়সী ১৮৭৩ সালে আরেক বিদূষী ‘বেগম রোকেয়া’র জন্মের সাত বছর পূর্বে নারী শিক্ষা প্রসারের লক্ষ্যে কুমিল্লায় একটি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এটি উপমহাদেশের বেসরকারিভাবে প্রতিষ্ঠিত মেয়েদের প্রাচীন স্কুলগুলোর অন্যতম।কালক্রমে এটি একটি কলেজে রূপান্তরিত হয় এবং এর নাম হয় নবাব ফয়জুন্নেসা কলেজ।
১৮৯৩ সালে পর্দানশীন , বিশেষত দরিদ্র মহিলাদের চিকিৎসার জন্য তিনি নিজ গ্রামে একটি দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপন করেন। নাম ছিল ‘ফয়জুন্নেসা জেনানা হাসপাতাল’।
তিনি ১৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, অসংখ্য দাতব্য প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, এতিমখানা সড়ক নিমার্ণ করে তাঁর মানবতাবাদী ও সমাজ সংস্কারের অনন্য দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেন।
১৮৯৪ সালে পবিত্র হাজ্বব্রত পালন করার প্রাক্কালে তিনি মক্কায় হাজীদের জন্য একটি ‘মুসাফিরখানা’ এবং মদিনায় একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রফেসর সোনিয়া নিশাত আমিন তাঁর ‘The World of Muslim Women in Colonial Bengal,1876-1903 গ্রন্থে বলেন, “At the time when sporadic efforts were taking place to develop the condition of education in this part of the world , a Muslim woman came forward with a daring plan to set up a school for PURDANASIN girls in comilla.”

পশ্চিমগাঁওয়ের নওয়াব বাড়ী’র সন্নিকটে ডাকাতিয়া নদীর পাড় ঘেষে ফয়জুন্নেসা বালকদের জন্য প্রতিষ্ঠা করেন একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। যা কালক্রমে ‘নওয়াব ফয়জুন্নেসা সরকারি কলেজ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানেও কলেজটি স্বীয় ঐতিহ্য আর সম্মান নিয়ে ডাকাতিয়া’র পাড়ে স্বীয় দ্যুতি ছড়িয়ে যাচ্ছে। ফয়জু্ন্নেসা’র ধর্মপরায়নতার উদহরণও ছিল অনন্য। জাতভেদ তিনি অত্যন্ত ঘৃণা করতেন। তাঁরই সাহায্য আর সহযোগিতায় লাকসামে নির্মিত হয়েছে অসংখ্য মন্দির,উপাসনালয়। তিনি নওয়াব বাড়ীর সদর দরজায় একটি দশ গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। এই মহৎ শিক্ষানুরাগী ‘কুমিল্লা ভিক্টরিয়া কলেজ’ প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে সেই সময়কার ১০ হাজার টাকা কলেজ নির্মানে দান করেন। নওয়াব ফয়জুন্নেসা তাঁর নওয়াব বাড়ীর অদূরে একটি ফ্রি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কালক্রমে যেটি বিস্তৃত হয়ে বর্তমানে ‘গাজীমুড়া আলিয়া মাদ্রাসা’ হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি তাঁর কন্যা বদরুন্নেসার সহযোগিতায় পশ্চিমগাঁওয়ে “নওয়াব ফয়জুন্নেসা ও বদরুন্নেসা উচ্চবিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করেন। যে বিদ্যালয় হতে অদ্যবধি অসংখ্য মেধাবী ছাত্র/ছাত্রী উল্লেখযোগ্য ফলাফল করে ‘কুমিল্লা বোর্ডে’ বিশেষ স্থান দখল করে আসছে।
ফয়জুন্নেসা বিভিন্ন সংবাদপত্র ও সাময়িকীর পৃষ্ঠপোষকতা করেন। বান্ধব,ঢাকা প্রকাশ, মুসলমান বন্ধু, সুধাকর, ইসলাম প্রচারক প্রভৃতি বাংলা পত্রপত্রিকা তাঁর আর্থিক সহায়তা লাভ করেন। সঙ্গীতসার ও সঙ্গীতলহরী নামে তাঁর দুখানি কাব্যের কথাও জানা যায়।
নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরাণী এমন এক সময়ে বাংলা ভাষ ও সাহিত্য চর্চা করেন যখন অভিজাত মুসলমানদের মধ্যে এই ভাষা ব্যবহার হতো না। নারী জাতিকে শিক্ষা-দীক্ষায় আর আধুনিকতায় এগিয়ে নিয়ে যেতে সে যুগে যা ছিল অকল্পনীয়! এই মহীয়সী রমনী ১৯০৩ সালে নিজ বাড়ীতে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। ২০০৪ সালে ফয়জুন্নেসা চৌধুরানীকে মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করা হয়।

বর্তমানে নওয়াব ফয়জুন্নেসার স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক স্থানগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগের অভাবে ধ্বংষপ্রায় হয়ে পড়েছে। নওয়াব বাড়ীর সেই জৌলুসও এখন আর আগের মতন নেই। ফয়জুন্নেসার বংশধরগণও আর তেমন নওয়াব বাড়ীতে তেমন একটা থাকেনা। নওয়াব বাড়ী’র পাশে যে ফয়জুন্নেসা স্মৃতি পাঠাগারটি আছে বর্তমানে সেটিও জীর্ণপ্রায় ।

» সাপ্তাহিক প্রতিবেদন

আদিবাসী নারী মুক্তিযোদ্ধা: যাঁদের ত্যাগে এ দেশ স্বাধীন হল

১৯৭১। স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত দেশবাসী। বাংলাদেশের ভূমিপুত্র আদিবাসীরাও যোগ দিয়েছিল এ যুদ্ধে। পাক হানাদার বাহিনীকে এ দেশের পবিত্র ভূমি থেকে বিতাড়িত করবার যুদ্ধে অনেক নাম-না-জানা আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা জীবন দিয়েছিলেন। সম্ভ্রম হারিয়েছিলেন অনেক আদিবাসী বোন। দেশের স্বাধীনতা পাবার জন্য যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন অনেকেই। আমরা বিস্মৃতিপ্রবণ। আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধাদেরই প্রাপ্য স্বীকৃতি দেয়া হয় নি। আর আদিবাসী নারী মুক্তিযোদ্ধাদের তো আরো অবহেলা করা হয়েছে। তাদের মাঝ থেকে কয়েকজনের আত্নত্যাগ তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
কাঁকন বিবি: ‘খাসিয়া মুক্তি বেটি’ নামে পরিচিত এই নারী প্রথমে রাজাকারদের হাতে ধরা পড়েন। অকথ্য নির্যাতন চালানোর পর তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় ‘টেংরা’ ক্যাম্পে। সেখান থেকেই তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য তথ্য পাচার করতেন। এমনকি অস্ত্র ও গুলি পাচার করে তিনি নিজেই নৌকা বেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে পৌঁছে দিতেন।
সুনামগন্জের পাক সেনাদের ঘাঁটির অবস্হান তিনি জানিয়ে দেন বিভিন্ন মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে। জড়ো করেন সব মুক্তিযোদ্ধাদের। পথে নদী পড়ায় নিজে অন্যদের সহায়তায় কলা গাছের ভেলা বানিয়ে নদী পার হন। তাঁর দেয়া তথ্য অনুযায়ী, আরেকদল মুক্তিযোদ্ধা উড়িয়ে দেয় নিকটবর্তী সেতুটি। তুমুল আক্রমণের মুখে পরাজয় বরণ করে পাকিস্তানী সেনারা। সেতু উড়িয়ে দেয়ায় রিইনফোর্সমেন্ট বাহিনী পাক সেনাদের সাথে যোগ দিতে না পারায় পরাজয় ত্বরান্বিত হয়।
লতিকা মারাক: ১৯৭১ এ এই কম্যুনিস্ট কর্মী ‘মুক্তিযুদ্ধ’ ও ‘নতুন বাংলা’ নামে দুইটি পত্রিকা বিলি করে বেড়াতেন তিনি রাঙ্গুরা এবং বাগমারা ক্যাম্পের যোদ্ধাদের মাঝে। এখন বৃদ্ধা তিনি। জীর্ন কুটিরে বসবাস করা এই বৃদ্ধার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, আপনি কি কোন পুরষ্কার আশা করেন দেশের কাছে? “নিজের দেশের জন্য কাজ করেছি, কিছু চাই না আমার”, সরল উত্তর এই নারী যোদ্ধার।
বিভা সাংমা: এই গারো নারী ৭১ এ সম্মুখ সমরে অংশগ্রহণ করেন। তিনি গারো মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করে যুদ্ধে পাঠাতেন।
সন্ধ্যা ম্রি ও ভেরোনিকা সিমসাং: ৭১ এ নার্সিং এর ছাত্রী এ দুজন মহিয়সী নারী সেক্টর ১১ এর ফিল্ড হসপিটালে যোগদান করেন নার্স হিসেবে। সেপ্টেম্বরে তারা শেরপুরে কাজ করেন। পুরো সময়টা তাঁরা যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের নার্সিং সেবা দিয়েছেন।
কাংকেত: ২১-২২ বছরের এই খাসিয়া তরুনী সিলেটে মুক্তিবাহিনীর গোপন সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করতেন। তিনি রাজাকারদের সাথে মিশে তাদের কাছ থেকে অপারেশনের গোপন তথ্য জেনে নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের জানিয়ে দিতেন।তাঁর দেয়া তথ্য অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধারা অপারেশন চালিয়ে পুরো এক দল রাজাকারদের হত্যা করে। এরপরই তাঁকে সন্দেহ করা হয়, গ্রেফতারের পর অবর্ণনীয় নির্যাতন চালানো হয় এই নারীর উপর। তবুও মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যাপারে একটি তথ্যও দেন নি তিনি। অত্যাচারের মুখে পাকিস্তানী ক্যাম্পেই একসময় প্রাণত্যাগ করেন এই বীর নারী।
তেরেসা মাহাতো: দিনাজপুর মিশন হাসপাতালে নার্সিং শিক্ষাপ্রাপ্ত এই নারী পাকবাহিনীর গুলিতে আহত হন আগ্রাসনের শুরুতেই। এরপর সুস্হ হয়েই তিনি যুদ্ধে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবায় যোগ দেন।
প্রিংছা খে: পাকাবাহিনীর ক্যাম্পে জোর করে ধরে নিয়ে যাওয়া এই রাখাইন নারী যুদ্ধের এক পর্যায়ে খাবারে বিষ মিশিয়ে হত্যা করেন ১৪ জন পাক সেনাকে।

» ফিচার প্রতিবেদন

নারী নির্যাতন : একটি দুঃখজনক বাস্তবতা

জ্ঞানবিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দিক দিয়ে বিশ্ব অভূতপূর্ব উন্নতি সাধন করলেও এখনো কিছু কিছু নৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা মানব সমাজকে পীড়া দেয়। এর একটি হচ্ছে নারী নির্যাতন। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী এবং সমাজের উন্নয়নে তাদের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু তারপরও সাধারণভাবে তারা শান্তি, নিরাপত্তা ও অধিকারের দিক দিয়ে এখনো পুরুষের সমকক্ষ নয়। জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের সাম্প্রতিক রিপোর্টে ( ৪ এপ্রিল ) বলা হয়েছে, বিশ্বের দরিদ্র জনগণের ৭০ শতাংশই নারী এবং মাত্র এক শতাংশ নারীর নিজস্ব মালিকানায় সম্পত্তি আছে। এ প্রতিবেদনটিই প্রমাণ করে যে, নারীরা কোনভাবেই পুরুষের সমানাধিকার পাচ্ছে না। এছাড়া দুঃখজনকভাবে বিশ্বের অধিকাংশ দেশে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় নারীরা নির্যাতিত হচ্ছে।

জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন কয়েকদিন আগে নারী নির্যাতন বিরোধী দিবসে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, ২০১৫ সাল নাগাদ এ ধরনের নির্যাতনের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ সংগ্রাম জোরদার করবে এবং নারীদের ওপর যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধেও তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে। গত ২৫শে ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে নারীর অধিকার ও তার দায়িত্ব কর্তব্য নিয়ে আলোচনা করা হয়। সম্মেলনে জাতিসংঘ মহাসচিব নারী নির্যাতনকে অগ্রহনযোগ্য উল্লেখ করে বলেন, নারী নির্যাতনের কোন ব্যাখ্যা থাকতে পারে না এবং এটি কোনক্রমেই সহনীয় নয়। বান কি মুন বলেন, বিশ্বের কমপক্ষে এক তৃতীয়াংশ নারী তার জীবনের কোন না কোন সময়ে শারিরীক নির্যাতন কিংবা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। এছাড়া গর্ভাবস্থায় ভ্রুনের লিঙ্গ সনাক্তকরণের পর বহু মেয়ে পৃথিবীর আলো দেখার আগেই নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার হচ্ছে। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বিশ্বের মোট নারীর শতকরা ৭০ ভাগ কমবেশী নির্যাতনের শিকার হয়। এ পরিসংখ্যান থেকেই বিশ্বব্যাপী নারী নির্যাতন যে কত অমানবিক অবস্থায় পৌঁছেছে তা অনুধাবন করা যায়। তবে নারী নির্যাতনের ধরন এক এক সমাজে এক এক রকম এবং কোথাও কোথাও নারীদের হত্যা করার মাধ্যমে নির্যাতনের পরিসমাপ্তি ঘটে।

নারী নির্যাতনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রূপ হচ্ছে স্বামীর হাতে স্ত্রী নির্যাতন। প্রতি তিন জন নারী’র একজন তার স্বামীর হাতে নির্যাতিত হয়। যে নারী ও পুরুষ জীবনে সুখী হওয়ার জন্য সংসার জীবন গড়ে তুলেছেন, তাদের কাছে এই পরিসংখ্যান অত্যন্ত দুঃখজনক। পবিত্র কোরানের সুরা রূমের ২১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “মহান আল্লাহ তোমাদের মধ্য হতে তোমাদের জন্য সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমরা পরস্পরের কাছে সুখ ও আল্লাহ’র রহমত লাভ করতে পারো। যারা চিন্তাশীল তাদের জন্য এতে আল্লাহর মহিমার নিদর্শন রয়েছে।” কিন্তু যে সব পুরুষ তাদের ঘরকে নির্যাতন কেন্দ্রে পরিণত করেন, যারা শুধু স্ত্রী নয় সেই সাথে সন্তানদেরকে শারিরীক ও মানসিকভাবে কষ্ট দেন, তারা আল্লাহ’র দৃষ্টিতে অত্যাচারী।

পরিসংখ্যানে আরো দেখা গেছে, যেসব নারী হত্যাকান্ডের শিকার হয়, তাদের শতকরা ৪০ ভাগ নিহত হয় তাদের স্বামীদের হাতে। নারী নির্যাতনের ঘটনা শুধু যে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে হয়, তাই নয়, বরং পশ্চিমা দেশগুলোতেও ব্যাপক মাত্রায় নারী নির্যাতন চোখে পড়ে। মার্কিন ফেডারেল পুলিশ বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের শতকরা ৭০ ভাগ পুরুষ তাদের স্ত্রীদের ওপর নির্যাতন চালায়। এর মধ্যে শতকরা ১৭ ত্রিশ ভাগ নারীর ওপর এত বেশী শারিরীক অত্যাচার চালানো হয় যে, তাদেরকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর ২০ থেকে ৪০ লাখ নারী পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়। জার্মানীতে সড়ক দুর্ঘটনাসহ অন্যান্য দুর্ঘটনায় যত মানুষ হতাহত হয়, তার চেয়ে বেশী সংখ্যক নারী স্বামীদের হাতে আহত কিংবা নিহত হয়। ফ্রান্সের পুলিশ বলেছে, রাতের বেলায় তাদের কাছে সাহায্যের আবেদন জানিয়ে যত ফোন আসে তার শতকরা ৬০ ভাগ আসে নির্যাতিত স্ত্রীদের কাছ থেকে। তারা তাদের স্বামীদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য পুলিশের স্মরণাপন্ন হন। এ পরিসংখ্যানটি আরো ভয়াবহ মনে হবে তখন, যখন জানা যাবে, যে সব নারী নির্যাতনের শিকার হন তাদের তিন জনের মধ্যে মাত্র একজন পুলিশকে ফোন করে থাকেন।

নারী নির্যাতনের যে ভয়াবহ রূপটি ব্যক্তিগত ও সমাজ জীবনের ওপর মারাত্মক ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলে সেটি হচ্ছে শ্লীলতাহানী। দুঃখজনকভাবে গত কয়েক দশকে এই বিষয়টি পশ্চিমা দেশগুলোতে ভয়াবহ রকমভাবে বেড়ে গেছে। পাশ্চাত্যে প্রতি ৫ জন নারী’র একজন জীবনের কোন না কোন সময়ে ধর্ষণ বা ধর্ষণের হুমকির শিকার হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর গড়ে এক লাখ ৩২ হাজার বলাৎকারের ঘটনা রেকর্ড করা হয়। ব্যক্তিগত ও সামাজিক সম্মান হারানোর ভয়ে যারা ধর্ষণের খবর প্রকাশ করেন না, তা হিসেব করলে এর পরিমাণ কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। এদিকে ধর্ষণের যে মারাত্মক ক্ষতিকর দিকটি তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে দেখা যায়, তা হচ্ছে কথিত সম্মান রক্ষার জন্য নারী হত্যা। কখনো কখনো ধর্ষিত নারী’র বাবা, ভাই, স্বামী বা অন্যান্য নিকটাত্মীয় পারিবারিক সম্মান রক্ষার জন্য ধর্ষিতাকে হত্যা করে। এক্ষেত্রে নারী দুই বার নির্যাতনের শিকার হয়। একবার অপরিচিতজনের কাছে নিজের সম্ভ্রম হারায়। এরপর পরিচিত জনদের হাতে জীবন বিসর্জন দেয়। জাতিসংঘের এক হিসেব অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর এ ধরনের কথিত সম্মান রক্ষার বলির শিকার হয় প্রায় ৫ হাজার নারী।

দেহ ব্যবসায় নারীকে বাধ্য করা হচ্ছে নারী নির্যাতনের আরেকটি ভয়াবহ রূপ যা কমবেশী সব দেশেই দেখা যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দারিদ্রের সুযোগ নিয়ে একশ্রেনীর মানুষরূপী পশু মেয়েদেরকে এ কাজে বাধ্য করে। এছাড়া অবৈধ সম্পর্কের পরিণতিতেও অনেক সময় মেয়েরা দেহ ব্যবসায় নামতে বাধ্য হয়। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে সুসংগঠিতভাবে একটি গোষ্ঠি নারীদের দেহ ব্যবসায় নামতে বাধ্য করে। দুঃখজনকভাবে ধর্ষণের মত অমানবিক ও অনৈতিক কাজ দিন দিন বেড়েই চলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে পত্রপত্রিকায় পশ্চিমা দেশগুলোতে নারী ও শিশু পাচারের ঘটনা অধিক হারে লক্ষ্য করা যায়। পাচার হয়ে যাওয়া নারী ও শিশুদেরকে ক্রীতদাসের মত কেনাবেচা করা হয় এবং কিছু লম্পট পুরুষ এসব অসহায় নারী ও শিশুর ওপর নির্যাতন চালায়। দুঃখজনকভাবে নারী ও শিশু পাচার বর্তমানে ব্যাপক লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। এ ব্যবসার ফলে একদিকে পাচারকারী দালালরা মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে, আর অন্যদিকে হাজার হাজার নারী ও শিশুর জীবনে নেমে আসছে চরম দুর্ভোগ ও দুর্বিসহ জীবন।

নারী নির্যাতনের আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে, শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগেই তার লিঙ্গ নির্ধারণ। দুঃখজনকভাবে এই একবিংশ শতাব্দিতে এমন অসংখ্য মানুষ আছে, যারা গর্ভস্থ সন্তান মেয়ে হলে তাকে মায়ের পেটের মধ্যেই মেরে ফেলতেও কুণ্ঠিত হয় না। একে জন্মের আগেই হত্যা বলে অভিহিত করা যেতে পারে। কখনো কখনো জন্মের আগে শিশুর লিঙ্গ নির্ধারণ করা না গেলে জন্মের সাথে সাথে শিশুকন্যাকে হত্যা করা হয়। সাম্প্রতিক কালে ভারতে এই প্রবণতা ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করা যায়, যার কারণে ভারতের কোন কোন রাজ্যে নারী ও পুরুষের আনুপাতিক হারে সামঞ্জস্যহীনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমে গেছে। এছাড়া যৌতুক বা পনপ্রথার কারণেও ভারতে ব্যাপক হারে নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। দেশটিতে প্রতি বছর ১২ হাজারেরও বেশী মেয়েকে পণ দিতে না পারার কারণে হত্যা করা হয়।

যুদ্ধের কারণেও বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে নারী হতাহত হচ্ছে। ইহুদীবাদী ইসরাইলী সেনারা ফিলিস্তিনী এলাকাগুলোতে যে ভয়াবহ গণহত্যা চালাচ্ছে, তার ফলে হতাহতদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ হচ্ছে নারী। কোন কোন যুদ্ধে নারীদের ওপর ব্যাপক হারে যৌন নির্যাতন চালানো হয়। এখানে উদাহরণ হিসেবে বলকান যুদ্ধের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। ঐ যুদ্ধে বসনিয়ার বিরুদ্ধে জাতিগত শুদ্ধি অভিযানের অংশ হিসেবে বর্বর সার্ব সেনারা বসনিয়ার নারীদের ওপর গণধর্ষণ চালিয়েছিল।

নারী নির্যাতনের এসব ঘটনা থেকে বোঝা যায়, বিশ্বের বিশেষ কোন একটি দেশে নারীদের ওপর যেমন নির্যাতন চালানো হয় না, তেমনি এ নির্যাতনের ধরণও এক এক যায়গায় এক এক রকম। যেমন নারীদের সম্ভ্রমহানী ও তাদের যৌন ব্যবসায় বাধ্য করার ঘটনা পশ্চিমা দেশগুলোতে বেশী দেখা যায়। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে অজ্ঞতা, কুসংস্কার ও অন্যায় সামাজিক প্রথার কারণে নারীরা বেশী নির্যাতনের শিকার হয়। এছাড়া নারীরা অনেক সময় সহিংস হামলার শিকার হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে আগ্নেয়াস্ত্র বহনের অনুমতি থাকায় নারীদেরকে যত্রতত্র হত্যা করা হচ্ছে। রাশিয়া ও ইউরোপীয় দেশগুলোতে অতিরিক্ত মাত্রায় মদ পান করার কারণে মাতাল স্বামীরা স্ত্রীদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নারীদের অধিকার সচেতনতার অভাব, স্ত্রী ও পরিবারের প্রতি পুরুষদের দায়িত্বজ্ঞানহীতা এবং নারীদের নীরবে নির্যাতন সহ্য করার প্রবণতা তাদের ওপর নির্যাতনের প্রধান তিনটি কারণ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নারী শিক্ষা এবং তাদের অধিকার রক্ষার ব্যাপারে বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠন গড়ে তোলার মাধ্যমে নারী নির্যাতন উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমিয়ে আনা সম্ভব। তবে সবার আগে সমাজের প্রচলিত ভুল রীতিনীতিগুলো পরিবর্তন করতে হবে এবং নারীদের প্রতি পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাতে হবে। সমাজে নারীকে মানুষ হিসেবে এবং সংসারে নারীকে সম অংশিদারিত্বের মর্যাদা দিতে হবে। ইসলামও নারীকে পুরুষের মত সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে ঘোষণা করেছে এবং তাদের প্রতি বৈষম্য করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। অবশ্য নারীদেরকেও সমাজে এমনভাবে চলাফেরা ও কাজকর্ম করতে হবে যাতে তাদের সম্মান, মর্যাদা ও সতীত্ব বজায় থাকে। উপযুক্ত পোশাক বা হিজাব পরিধানের মাধ্যমে নারী সমাজ নিজেদেরকে লোলুপ পুরুষদের হাত থেকে রক্ষা করতে পারেন। ইসলামের দৃষ্টিতে পরিবার প্রেম ও ভালোবাসার স্থান এবং এখানে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা থাকতে হবে। কারণ, নারী নির্যাতন কঠিন অপরাধের কাজ এবং এ কাজে মহান আল্লাহ মারাত্মকভাবে অসন্তুষ্ট হন।