» প্রতিবেদন

আদিবাসী নারী মুক্তিযোদ্ধা: যাঁদের ত্যাগে এ দেশ স্বাধীন হল

১৯৭১। স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত দেশবাসী। বাংলাদেশের ভূমিপুত্র আদিবাসীরাও যোগ দিয়েছিল এ যুদ্ধে। পাক হানাদার বাহিনীকে এ দেশের পবিত্র ভূমি থেকে বিতাড়িত করবার যুদ্ধে অনেক নাম-না-জানা আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা জীবন দিয়েছিলেন। সম্ভ্রম হারিয়েছিলেন অনেক আদিবাসী বোন। দেশের স্বাধীনতা পাবার জন্য যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন অনেকেই। আমরা বিস্মৃতিপ্রবণ। আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধাদেরই প্রাপ্য স্বীকৃতি দেয়া হয় নি। আর আদিবাসী নারী মুক্তিযোদ্ধাদের তো আরো অবহেলা করা হয়েছে। তাদের মাঝ থেকে কয়েকজনের আত্নত্যাগ তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
কাঁকন বিবি: ‘খাসিয়া মুক্তি বেটি’ নামে পরিচিত এই নারী প্রথমে রাজাকারদের হাতে ধরা পড়েন। অকথ্য নির্যাতন চালানোর পর তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় ‘টেংরা’ ক্যাম্পে। সেখান থেকেই তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য তথ্য পাচার করতেন। এমনকি অস্ত্র ও গুলি পাচার করে তিনি নিজেই নৌকা বেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে পৌঁছে দিতেন।
সুনামগন্জের পাক সেনাদের ঘাঁটির অবস্হান তিনি জানিয়ে দেন বিভিন্ন মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে। জড়ো করেন সব মুক্তিযোদ্ধাদের। পথে নদী পড়ায় নিজে অন্যদের সহায়তায় কলা গাছের ভেলা বানিয়ে নদী পার হন। তাঁর দেয়া তথ্য অনুযায়ী, আরেকদল মুক্তিযোদ্ধা উড়িয়ে দেয় নিকটবর্তী সেতুটি। তুমুল আক্রমণের মুখে পরাজয় বরণ করে পাকিস্তানী সেনারা। সেতু উড়িয়ে দেয়ায় রিইনফোর্সমেন্ট বাহিনী পাক সেনাদের সাথে যোগ দিতে না পারায় পরাজয় ত্বরান্বিত হয়।
লতিকা মারাক: ১৯৭১ এ এই কম্যুনিস্ট কর্মী ‘মুক্তিযুদ্ধ’ ও ‘নতুন বাংলা’ নামে দুইটি পত্রিকা বিলি করে বেড়াতেন তিনি রাঙ্গুরা এবং বাগমারা ক্যাম্পের যোদ্ধাদের মাঝে। এখন বৃদ্ধা তিনি। জীর্ন কুটিরে বসবাস করা এই বৃদ্ধার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, আপনি কি কোন পুরষ্কার আশা করেন দেশের কাছে? “নিজের দেশের জন্য কাজ করেছি, কিছু চাই না আমার”, সরল উত্তর এই নারী যোদ্ধার।
বিভা সাংমা: এই গারো নারী ৭১ এ সম্মুখ সমরে অংশগ্রহণ করেন। তিনি গারো মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করে যুদ্ধে পাঠাতেন।
সন্ধ্যা ম্রি ও ভেরোনিকা সিমসাং: ৭১ এ নার্সিং এর ছাত্রী এ দুজন মহিয়সী নারী সেক্টর ১১ এর ফিল্ড হসপিটালে যোগদান করেন নার্স হিসেবে। সেপ্টেম্বরে তারা শেরপুরে কাজ করেন। পুরো সময়টা তাঁরা যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের নার্সিং সেবা দিয়েছেন।
কাংকেত: ২১-২২ বছরের এই খাসিয়া তরুনী সিলেটে মুক্তিবাহিনীর গোপন সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করতেন। তিনি রাজাকারদের সাথে মিশে তাদের কাছ থেকে অপারেশনের গোপন তথ্য জেনে নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের জানিয়ে দিতেন।তাঁর দেয়া তথ্য অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধারা অপারেশন চালিয়ে পুরো এক দল রাজাকারদের হত্যা করে। এরপরই তাঁকে সন্দেহ করা হয়, গ্রেফতারের পর অবর্ণনীয় নির্যাতন চালানো হয় এই নারীর উপর। তবুও মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যাপারে একটি তথ্যও দেন নি তিনি। অত্যাচারের মুখে পাকিস্তানী ক্যাম্পেই একসময় প্রাণত্যাগ করেন এই বীর নারী।
তেরেসা মাহাতো: দিনাজপুর মিশন হাসপাতালে নার্সিং শিক্ষাপ্রাপ্ত এই নারী পাকবাহিনীর গুলিতে আহত হন আগ্রাসনের শুরুতেই। এরপর সুস্হ হয়েই তিনি যুদ্ধে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবায় যোগ দেন।
প্রিংছা খে: পাকাবাহিনীর ক্যাম্পে জোর করে ধরে নিয়ে যাওয়া এই রাখাইন নারী যুদ্ধের এক পর্যায়ে খাবারে বিষ মিশিয়ে হত্যা করেন ১৪ জন পাক সেনাকে।